বাংলা কবিতা, কবি এবং আমি

বাংলা কাব্যে পরিবর্তন এসেছে কোথায়? কবিতা! কবি! নাকি আমিই বদলে গেছি!

লাইলীর স্কুল জীবনে লেখা একটি বাংলা কবিতার নাম "কান্নার সুখ" এবং তথায় লেখা দুটি লাইন রকম- "তোমাকে দেখে দেখে শুধু অশ্রু জলে ভাসিকুসুমের পালকে উড়ে উড়ে স্মিত হাসি।" কয়েকদিন পর তার কাছে দ্বিতীয় লাইনের "কুসুমের পালক" শব্দ দুটি যুতসই মনে না হওয়ায় তা বদলে 'বিহঙ্গের ডানা' লিখে দেন। সেদিন কথা প্রসঙ্গে লাইলী বিষয়টি উল্লেখ করে বললেন জানো, সেই "কুসুমের পালক" শব্দ দুটি এখন কবিতায় নেই কিন্তু আমার মনের ভিতর ঠিক বসে আছে আজও, আসলে চাইলেই সবটুকু বদলানো যায় না।  

 কবিতা কথনঃ 

আগে হলে বলতাম, আমি অতি ভাবুক স্বভাব প্রেমিক তাই কবিতা লিখি কিংবা এই ছন্দবদ্ধ শব্দগুলি আসলে তোমাদেরই উচ্ছাসিত অবহেলা মন্ডিত শুকগাথা আর সভ্য দস্যুদের মুখ নিঃশ্রিত লালার স্তোপ। হয়ত দেখতাম হারিচাচা বসে আছে মান্দারের ডালে ধিক্কারের স্তবক ঠোঁটে নিয়ে কিংবা শিমুল, পলাশ অশ্বল্থের শিখরে মধুকরী বিহঙ্গের অসহায় আকুতি; ঘরের মেঝে খুরে সর্পের ডিমের আফসোস অথবা ডাহুক শেয়ালের আঁধার বিদারী শূক প্রলাপ আর শঙ্খ, শালুক, জোনাকীদের হতাশার কথা বলতাম।

সার্কাস, যাত্রা, জারি সারি, পালাগানের মর্ম-ভষ্ম বিধূর উপাখ্যান, বেহুলা কীর্তনের কথা বা যারা আজ কোথাও নেই! সাহিত্যের পাতায় আছে শুধু যাদের অভিমানযারা একদিন কাব্যের মুচ্ছনা ছিলেন তাদের ক্রন্দনের কথা বলতাম। যাদের অবর্তমানে আবহমান বাংলার কৃষ্টি-রীতি-প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে তাদের বেদনা বিধুর মুখগুলো মনে করতাম। হয়ত সেইসব বিলুপ্ত প্রাণগুলো আমাদের জন্য কতখানি থুথু জমিয়ে রেখেছে ঠোঁটে তাই নিয়ে ভাবতাম

যাইহোক, প্রশ্ন হলো এখন আমি কি ভাবছি বা বলছি! সেটাই আসলে বেশি জরুরী, যা খোলাসা করার আগে প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় আলোকপাত করছি। 

 কবিতার সাথে সংস্কৃতি শিল্পকলা:

হালকা ভাবে কাব্যের গন্ডি নির্ধারণ অত সহজতর বিষয় নয়, আবেগী ভাবনায় বিশ্লেষণ করলে জীবনের সাথে কাব্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বলা যায় জগৎ সংসারের সমূদয় বিষয় কাব্য সাহিত্যের অন্তর্গত এবং পরস্পরের সম্পর্ক সুনিবিড়। বাঙালীর সাহিত্য, শিল্পকলা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন একি সূত্রে গাঁথা এবং মানবীয় জীবন আচরণের সাথে সম্পৃক্ত। খোলা চোখে তাকিয়ে আমরা পরিবর্তন দেখতে পাই শিক্ষা, ফ্যাশন, প্রযুক্তি, খাদ্যাভ্যাস, আচরণ, লোকজ উৎসব সর্বত্র। যার প্রধান নিয়ামক হলো বিজ্ঞান প্রযুক্তি।

মানুষের আচরণ, চিন্তাচেতনা, মূল্যবোধ তথা জীবনের সাথে সবসময় সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ ঘটে থাকে এবং এটা ইতিবাচক ধরে নেওয়া যায়। পরিবর্তন চিরাচরিত জাগতিক নিয়ম যার ভিতর দিয়ে আমরা বেড়ে উঠি, নতুনকে খুঁজি। পরিবর্তন একটা গতি এবং পরিবর্তন আছে বলেই ধরাধাম এত সুন্দর আর বৈচিত্র্য পূর্ণ। পরিবর্তন হীনতা মৃত্যু সমতুল্য। আমরা প্রতিটি পরিবর্তনের মাধ্যমে সুন্দরকে চাই, জগতের ক্ষতিকারক কোন কর্ম আমরা সহ্য করতে পারব না। বিশেষ করে এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ যেন স্বাচ্ছন্দে বাঁচে এই মমত্ববোধ টুকু বুকে ধারণ করা উচিৎ। ধরার মাঝে কোন বস্তু অবহেলিত, অবজ্ঞার নয়; পথের একটি  ধূলিকণা তারুণ্যদীপ্ত মহাকাব্যের অর্থবহ নিয়ামক হতে পারে। সহমর্মিতাই যেন হয় কর্ম কারণ আর পরিবর্তনগুলো মঙ্গলময় জীবনের জন্য নিবেদিত। সংস্কৃতি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে সৃজনশীল উদ্যমি মনের মানুষের ভূমিকা অগ্রগণ্য। যারা প্রতিটি পরিবর্তনকেই মঙ্গলময় যথার্থ রূপ দানের চেষ্টা করেন এবং যা আবহমান কাল ধরে বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন প্রনালী ঐতিহ্যকে মহিমান্বিত করেছেন। 


বাংলা কবিতা, কবি এবং আমি

এক সময় প্রথম সাহিত্যকর্ম চর্যাপদ এবং বৈষ্ণব পদাবলী, কাব্য কাহিনী, কল্পকাহিনী পুঁথি সাহিত্যের খুব কদর ছিল এবং এগুলো মানুষের জীবনের সাথে আবেগের সাথে জড়িয়ে ছিল সুখে দুঃখে। কিন্তু আজকে সবই প্রায় বিলুপ্তির পথে। অবহেলিত পুস্প মুঞ্জরী লুটিয়ে গেছে ধূলি ধূসর বেদনার নীল বাসরে। ভাড়াক্রান্ত হৃদয়ে যেন শোনি, হায় বিধান লিপি, কষ্টার্জিত সুখ, মাধূরীর মুক্তা ঝরানো বেলা, সবি কি তবে ছল! আসলে কাল বাস্তুর উপযোগিতা পরিনতি নির্ধারণ করে, আর আজ কাল পরশুর কর্ম ফলগুলো কালের স্বাক্ষি হয়ে বেঁচে থাকে। 

দিন-মজুরের জীবন, পথের অনাথ শিশুর মুখের হাসি কিংবা অবহেলিত কোন বৃদ্ধের ব্যর্থ সংসারের পরিহাস কাঁধে নিয়ে পিচঢালা পথে কবিতার মিছিল চলছে এবং বেঁচে থাকার কৌশল আর জীবনের গল্পের সাথে কত কাব্য মরে যায় নয়নের জলে! শুধু যুগ বিদারী মোহ মায়া চেয়ে থাকে ফেলে আসা পথপানে উদাসীন দৃষ্টির প্রদীপ জ্বেলে

প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সংসার, মুল্যবোধ কতকিছু বদলে যায় প্রয়োজনের বিলাসীতায়। তবুও কবিতা জীবন ধারন করে থাকে ঠায় জীবনের ঊষ্ণতায়। কবিতা বুঝিবা শিশু, সবকিছু বদলে যায় শিশুরা তবু তাদের শ্বাশত রুপস্বভাব নিয়েই বেঁচে থাকে হাসিখুসী। আমরা চারপাশের জীবনগুলোকে কত অবলিলায় পিষ্ট করতে পারি! যেভাবে অবজ্ঞা করতে পারি পাড়া-পর্শিদের অধিকার অথবা নিজেরাই তৈরী করতে পারি নিয়ম-অনিয়মের সমূদ্র আর প্রতিদিন পরিবেশ মৈথুন করে বাড়াতে পারি অনাগতদের মজ্জা নির্গত ক্রন্দন।

আমাদের স্বেচ্ছাচারী স্বাধীনতার বলী যারা তাঁরা আমাদের ক্ষমা করবেতো? আর ক্ষমা প্রার্থীর বিষয়টি মানব মর্যাদার সাথে জড়িত নয় কি?

ময়ুর পঙ্খি নাও, হংস সারিকা, শিমুল, পলাশ, হিজল, তমাল, অশ্লথ, মান্দার, শালুকের বিষাদ! শালিক, শকুন, সূইচুরা, মদনটেক, চুনোপুঁটি, চাতকের তৃষিত বদন! শজারু, সর্প, শেয়ালের হাঁক, কলসি কাংকে পল্লিবধূর আঁচলের মায়া কিভাবে হাহাকার ছড়িয়ে থাকে আকাশে, দিগন্তে, প্রহরে, ক্ষুধিত পাষাণে

কাল এবং কবিতা

কাল বহে নিরবধি। কালের স্বভাব অস্থির। কাল বদলায় সাথে স্থান পাত্র কেউ বদলিয়ে ছাড়ে। মানুষের বৃত্ত, দম্ভ, ঐশ্বর্য, রুপ লাবণ্য কেড়ে নিয়ে হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেয়। কালের অবর্তমানে পরিবর্তন অসম্ভব। কেউ বলে ইহকাল পরকাল কেউবা বলে কালে কালে তিন কাল, আবার কখনও মহাকাল। দৃষ্টি কোণ ভেদে কালের সংজ্ঞা বহুধা বিভক্ত। আমার কাছে কাল নিঃকষ, প্রকারহীন, স্থিতু! কাল হলো মানব সৃষ্ট ঘটনা বর্ণনের চিহ্ন। ভৌত বস্তূর চক্রাকার গতি। মানুষ ছাড়া জগতে আর কারো কাছে কালের হিসেবের প্রয়োজন কিংবা গুরুত্ব নেই। "তিরিশ মিনিটে অর্ধ ঘন্টা" এই আবিষ্কারের তাৎপর্য বা অর্থ আমাদের গ্যালাক্সির বাহিরে কতটুকু! তা অজানা। যার আদি এবং অন্ত অজানা তার অস্তিত্ব নিয়ে কৌতুহল থাকা অস্বাভাবিক কিছু না। মূলত পারিপার্শ্বিক নিয়ামক গুলো নিজেরাই পরিনতির অপেক্ষা করে অথবা স্বিয় যোগ্যতা ক্ষমতা হারিয়ে নিজ গন্তব্যে ফিরে যায়।

তবে আমিও আপনার মত এই সৃষ্ট কালের হাতে বন্দী। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ কালভীতি আমাদের মজ্জার গভীরে মিশে আছে। এক জন্মে তা অতিক্রম অসম্ভব! তাই বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, "আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতা কালের সঙ্গে বাঁধা এবং কালহীন অভিজ্ঞতাকে কল্পনা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু যদি তা সম্ভবও হত স্ববিরোধিতা ছাড়া আমরা কখনই মনে করতে পারতাম না যে আমরা কখনও ধরণের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারব।"

কালের তত্ত্ব-ভেদ আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। যাইহোক আমরা যেমন ছিলাম, স্থান কাল পাত্র ভেদ অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু কবিতা! আসলে কাব্য সাহিত্য কি বদলের যোগ্য, নাকি বদলানো যায়! কবিতা বহমান একটি নদী, কালের বুকে বিছিয়ে চলছে তার কুলু তান। কবিতা বুঝিবা মায়ের বুকে জমানো মমতা কিংবা আকাশের নীল। পরিবর্তনের সাথে হেঁটে চলেছে আলোক প্রদীপ জ্বলে। বিষয়টি বুঝানোর জন্য এখানে আমি আমার লেখা দুটি কবিতা উপস্থাপন করছি এবং কবিতা দুটির রচনার কাল পার্থক্য ত্রিশ বছর। 


বাংলা কবিতা, কবি এবং আমি

 

() "তুমি এলে” 

 নলিনী শূন্য বাটে চৈত্রী দিবসে তুমি এলে!

নিভৃত স্তব্ধ কুঞ্জের বোল
ঘন মেঘের পশ্চাতে চাঁদ
নীরব ছায়াসম তুমি এলে।

তুমি এলে মোর হিয়ার আদর অতল চাদর ছুঁয়ে;

বুঝিনি আমি খুঁজিনি একটুও
কখন মায়া পুস্প ভারে তব পদ পানে
সর্বস্ব মোর বিলিন হয়েছে নূয়ে।

 তুমি এলে,

প্রাণ রস শোষিল তৃষিত তৃর্ণ
গোধূলি বেলায় বালিকা পেল কামনার প্রথম চুম্বণ;
শালিক ছানা উড়িল
ফাগুনে পত্র-পল্লব ঝড়িল
ভিজিল হৃদয় গহ্বর মোর 
পরম পাওয়ার সুখ অশ্রু জলে
তুমি এলে। 

 

() "বীত প্রহর" 

 সাধ জাগে কখনও চুপটি করে শুনি

তারা ভরা রাত জাগা কুহক -শীরীন মধুরা
নাকি ঘোটে কুড়ানী মায়ের
যজ্ঞের পরান -নয়ন তারা
কি নামে ডাকে তোমাকে?
অকৈতবে ক্ষণে ক্ষণে
মায়া মোহিনী মমতার সুরে।

 উচ্ছ্বল খিলখিল ধ্বনিতে

ঝড় ঝড় মুক্তা ঝড়ে কতখানি?
উর্বশীর অধর পল্লবে।
ঝর্ণা ধারায় কতক্ষন ভিজ অভিমানে আজও!

 ওগো অতসী যুথিকা মুল্লিকা,

যে দিন এসে চলে গেছে মুচকুন্দ বনে
তপস্বীর ক্ষোদিত প্রলাপে মরে।
বলোনা গো, তনিমার মস্তকে তোমরা এখন
কতখানি আয়েসী চিত্তচঞ্চোল মিথুন কল গৌরবে!
কতখানি প্রভা ছড়াও সংসারে অনুরাগে
কিরণময়ী আদুরী তুমি!

 হায় অমল ধবল দক্ষিণা পবন

দিবা নিশি উল্মক পুণ্যতিথি
অস্তাচলগামী পরমাত্না তোমরা বলো
বীত কৈবল্য নুকতা সর্বস্ব বলো,
মোর উপাংশু জপ নীরাঞ্জনা থরেথরে
যতখানি আলোক প্রভা ফেলানীর বুকে
যতখানি জ্যোতিময়ী কমল কোরক
তুমি ছিলে উলুখাগড়ার বনে
অনন্ত প্রহরে অন্তরে অলখ ঝোরায়!
তেমনি কি আছো আজও
হেমন্তের অন্তনীলে-হাসিখুশি

 কবি কথাঃ 

প্রকৃতির ললিত রুপ, নারী বিরহ নাকি কোন এক নিঃকর্মন্যকে বাড়ি থেকে বিতারিত করার প্রতিদান কিংবা ভাগ্য ত্বারিত হয়েই আমি কবি! যিনি কবি তিনি কাল বিশারদ, চিরনবীন। অগ্র এবং অন্তে ঘুরে বেড়ায় কালের কণ্ঠে ভেসে। আমি কবিকে দেখেছি ভৌতিক মাত্রা ছাড়িয়ে অসীমের হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে। দিগন্তে হেলান দিয়ে থাকা অমিয় রুপে।

একজন কবি পৃথিবীকে বেদনাদায়ক মনে করেন না বরং প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুর গতিময়তা উপভোগ করেন জীবনের সাথে মিশে স্বাচ্ছন্দে কালের পালকে ভেসে ভেসে এবং প্রতিটি মুহূর্ত তিনি উপলব্ধি করে থাকেন নতুন ভাবে নতুন ছন্দে। কখনও নিজেকে জগতের নিত্য লীলায় ভাসিয়ে দিয়ে হন আত্নহার। কবির পরিবর্তন এতটুকুই। 

হতে পারে অনেক কিছুই বস্তুবাদী বা নৈরাশ্যবাদীদের কাছে  অর্থহীন। যদিও জগতে অর্থহীন কিছুই নেই। কবি সব সময় তত্ত্বোন্নেষী। খোলা চোখে আমরা যা দেখি তার থেকে ভিন্ন কিছু। মনের প্রকৃতি হলো যৌক্তিক সীমারেখা অতিক্রম, চঞ্চল, উন্মুক্ত, বাঁধন হারা। কবি নিজেকে জগতের ইচ্ছার সাথে লীন করে কাল চক্রের মালা গেঁথে চলেছেন মাধবী লীলা কঞ্জবনে। তার অর্থ এই নয় যে, সুখী জীবন আচরণ বা সমৃদ্ধ পৃথিবী সমন্ধে তিনি উদাসীন। না তা কখনোই নয় মূলতঃ কবি স্বভাবগত ভাবেই সুন্দরের পুজারী নির্মলতায় বিশ্বাসী। তাই আমরা কখনও তাকে দেখতে পাই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক হয়ে রাজপথে উদ্ভাসিত। কখনও যোদ্ধ, অনাহার, শোষনের বিরুদ্ধে সোচ্চার অথবা ব্যাথিতের ব্যাথায়  ভারাক্রান্ত সমব্যাথী।

 

বাংলা কবিতা, কবি এবং আমি

আমি বিত্তান্তঃ 

কবি কবিতা সম্পর্কে আগে হলে অনেক কিছু বলতাম। যেমন কবি কোন ব্যক্তি নয় তিনি একটি বস্তু। হয়ত এও বলতাম, ব্রম্মচারী এই মনটাই কবিতার আসল জনক। যাইহোক আগের কথা পড়ে থাক পিছনে এখনকার প্রাসঙ্গিক কথায় আসা যাক।

কবি এবং কবিতার সাথে জড়িয়ে আমি নিজেকে কতটুকু বদলাতে পেরেছি! যদিও জগতের প্রতিটি উপাদান প্রতিনিয়ত একটি অবধারিত পরিবর্তনের মধ্যে গতিশীল এবং কালচক্রের সাথে একটা ভারসাম্যপূর্ণ নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। তবুও আমাদের সব সময় চাওয়া উচিত যেন ভৌতিক পরিবর্তন গুলো হয় জীবনের কল্যাণে। কিন্তু খুবই দুঃখজনক যে আমরা অজান্তেই চারপাশের জীবন গুলোকে বড় বেশি অবহেলা করে চলেছি। বিশেষ করে যাদের সাথে আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন জড়িয়ে আছে তাদের। আমরা অনেকের আবাসনের স্থানটুকুও কেড়ে নিয়েছি। তাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ, জীব, পক্ষি, কীটপতঙ্গ আজ আমাদের অবজ্ঞার যন্ত্রনা বুকে ধারণ করে হারিয়ে গেছে চিরতরে। অনেকেই চলছে যাওয়ার পথে বসে আছে অভিমানী নয়ন ভরা অশ্রু নিয়ে। হায়, কি নিদারুণ আবেগহীন আমাদের চেতনার স্তরগুলো! যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা পেয়েছি  তার কতটুকু জীবনের উৎকর্ষ সাধনের কাজে লাগিয়েছি! নাকি তা নিজেদেরই ক্ষতবিক্ষত করার কাজে লাগাচ্ছি!

অজান্তেই প্রশ্ন জাগে, "শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড" আসলে কি তাই! শিক্ষা শব্দটি শোনলে বই, খাতা, কলম, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাই এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই আমরা এখানে যদি শিক্ষা অর্থে ধরে নেই। অথবা নেপোলিয়ানের সেই কথাটি "আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব" নারী শিক্ষার প্রসঙ্গে অনেকেই কথাটি উদৃত করে থাকি এবং হয়ত বাক্যটি শ্বাশত বলেই মানি। হয়তো উক্তিটি শোনলে মনের মধ্যে কিছু পাওয়ার একটা সুখকর আশা জাগ্রত হয়ে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীর অনেক দেশ তথা বলা যায় আমাদের দেশেও শিক্ষিত মা প্রায় ঘরে ঘরে এবং শিক্ষিত জাতিও পেয়েছি আমরা। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই শিক্ষিত জাতি পেয়ে আমাদের লাভ বা লোকসান হয়েছে কতটুকু এবং সর্বসাধারণের প্রাপ্তির জায়গাটা কোথায়? যখন প্রতিটি শিক্ষিত জাতির নাগরিকদের মুখ দেখি উদ্বিগ্ন বিষন্ন এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্ণীতি, আত্নপ্রেম, সৎকর্মে উদাসীনতা, লাম্পট্য, লালসা, কেমিক্যালের বহুবিধ ব্যবহার লাগামহীন ভাবে বাড়ছে। আমি জানি না বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাক্যটি কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আমার মনে হয় সকল আশাই কঠিন দুরাশা যেখানে শিক্ষা হয় জ্ঞানশূন্য।

আসল বিষয় হচ্ছে এই যে, শিক্ষা কি তার ঠিক জায়গায় আছে নাকি কোন বিবর্তনের পথে হাঁটছে। যখন দেখতে পাই শিক্ষিত জাতিগুলো তার মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। সংসার, ধর্ম, কর্ম প্রতিটি ক্ষেত্রে জীবন বড়ই উদ্বিগ্ন, দিশেহারা এবং সভ্য দেশগুলো তাদের শুল্ক ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত বেশির ভাগ অর্থ পরস্পরের নাগরিকদের হত্যা করার কাজে ব্যয় করছেন। বিরোধী মতাবলম্বীদের হত্যা, সংঘবদ্ধ হামলা, ডাইনি শিকার, লুট, আইনের অপব্যবহার, অস্ত্র-বিষাক্ত গ্যাস দ্বারা নির্বিচারে হাজার মানুষের হত্যাকাণ্ড পরিচালনা, অন্তত সবের একটাও কি শিক্ষিত জাতির প্রমাণ বহন করে? এটা এমন একটা সময় যেখানে মানবতা অশুভ চক্রের হাতে বন্দি এবং এই সংকটে আদর্শবান কষ্টসহিষ্ণু সমাজসেবক, সূর্যস্নাত স্বদেশপ্রমিক সবাই দেশের কাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শাসক শ্রেণীর দুঃশাসন, রাজনীতিবিদদের লাম্পট্য, বুদ্ধিজীবীদের নোংরামি, যাজকদের আত্ন উদ্ধারের পরিবর্তে অর্থ রোজগারের ফিকির, শিক্ষিত মহলে হেন কর্ম চলছে দেদারসে। আশ্চর্য জনক বিষয় এটা যে, এই সমস্ত কর্মকে তারা পাপ বা অপরাধ বলে মনে করছে না।

সুখী জীবন নয় আমরা সবাই ছুটছি অর্থনৈতিক সাফল্যের পিছনে। আমাদের চাওয়াটা অসীম। যেন পুরো পৃথিবীটা পেলে আমি চেয়ে থাকি তারার পানে। হয়তোবা আমাদের ভুলটাও এখানেই। আমরা নুতন প্রজন্ম বা সন্তানের কাছে শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চাচছি এবং সেতো তাই আনার চেষ্টা করছে সেটা কারো ঘাড়ে চাপিয়ে হলেও, অন্তত পিতার খুশির জন্য। তাই সবার আগে সন্তানের কাছে, পরিবারের কাছে, সমাজ রাষ্ট্রের কাছে আমাদের চাওয়া বা প্রত্যাশার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে এবং গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে আসলে জীবন ধারণের জন্য আমারা কি চাই বা আশা করি; তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সামনে হয়ত তাই এসে হাজির হবে যা আমরা আকাংখ্যা করি। নাকি একলিজিয়াষ্টেসের লেখকের সেই কথাটি সত্যি ধরে নেব যে, " আমি অন্তর দিয়ে জানতে চেয়েছি জ্ঞানকে, জানতে চেয়েছি উম্মাদনা মূর্খ্যতাকে। আমি দেখেছি আত্না এতেও পীড়িত হয়, কারণ যত জ্ঞান তত অনুতাপ। যে মানুষ জ্ঞানকে বাড়াবেন সে দুঃখকেই বাড়াবেন।

এখন কবিতার জন্য শব্দ সাজানো কিংবা শব্দের জন্য তোমার মুখ পানে তাকিয়ে থাকার কোন ধৈর্য অবশিষ্ট নেই। ওরা চলে গেছে শকুনের পালকে ভেসে ভেসে আশাহত চাতকীর গোলাপী ঠোঁটে। আজ এখানে কবিতা আর নেই। হয়তো আমি নিজেই কবিতা হয়ে মরে আছি উদ্ভাসিত বর্ণমালার মিছিলে। অথবা বিলুপ্ত প্রাণ ভাষার দীর্ঘশ্বাসে হারিয়ে গেছে কবিতা।

 ...................................